মাসিক? রজঃস্রাব? শরীর খারাপ? কিম্বা ভাষা বদলিয়ে পিরিয়ড কিম্বা মেন্সট্রুয়েশন? 'ছি ছি এত্তা জঞ্জাল'? নাকি একেবারেই বিশুদ্ধ রক্ত? মেয়েদের একান্ত ব্যক্তিগত 'খুব ঘেন্নার' জিনিসটার পিছনের কারণটা কী?

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দু ধরনের জননচক্র দেখা যায়। ঋতুস্রাব চক্র (ইস্ট্রাস সাইকেল) এবং রজঃস্রাব চক্র (মেন্সট্রুয়াল সাইকেল)। রজঃস্রাব মানুষ ও অনান্য প্রাইমেটদের (যাদের হাতে 'বুড়ো' আঙুল থাকে যথা, শিম্পাঞ্জি, বেবুন, ওরাংওটাং ইত্যাদি)।  আর ঋতুঃস্রাব অনান্য স্তন্যপায়ী (কুকুর বেড়াল বাঘ কিম্বা ইঁদুর ইত্যাদি) এর দেহে ঘটে। আজ রজঃস্রাব বলি। পরের সপ্তাহে ঋতুস্রাব নিয়ে আসবো।

মানব নারী শরীরের এই রজঃচক্রের ইংরেজি নাম 'মেনস্ট্রুয়েশন' লাতিন শব্দ 'মেনসিস' মানে 'মাস' থেকে এসেছে। প্রতিমাসে একটি করে ডিম্বানু পরিনত হয় তারপর নিষিক্ত না হলে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যাওয়ার পরে যোনী থেকে রক্তক্ষরণ হয়। এই রক্তক্ষরণ সাধারণত ৫-৭ দিন চলে। এইটাই রক্তস্রাব বা রজঃস্রাব৷

নারী শরীরে দুটি ডিম্বাশয় (ওভারি) থাকে। যা প্রায় কয়েক লক্ষ ডিম্বানু সমেতই জন্মায়। বয়ঃসন্ধির (পিউবার্টি) সময় থেকে ফিমেল গোনাডাল হরমোনের কারণে ডিম্বানুর পরিনত হওয়া শুরু হয়। প্রাথমিক ডিম্বানু (প্রাইমারি ফলিকল) থেকে ধাপে ধাপে গ্রাফিয়ান ফলিকল (সম্পূর্ণ পরিনত ডিম্বানু) তে পরিনত হয়। তারপর ডিম্বানু থেকে ডিম্বক (এগ) টি গ্রাফিয়ান ফলিকলকে ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে ডিম্বাশয় থেকে। তারপর ওভিডাক্ট (অন্য নামে ফ্যালোপিয়ান টিউব) বেয়ে নেমে আসে জরায়ু (ইউটেরাস) তে। তারপর চেপে বসে।

 যেহেতু ওখানে এসি মেট্রোর মতো আরামদায়ক সিটের ব্যবস্থা নেই। আর আমরা (মহিলারা) দিব্যি নাচানাচি করে বেড়াই, তাই ডিম্বানুর গায়ে থাকা আঙুলসদৃশ অংশ গুলো গেঁথে দ্যায় জরায়ুর গায়ে। তারপর অপেক্ষা করে পুরুষাঙ্গ নিসৃত সিমেনের। সিমেন এর মাধ্যমে শুক্রাণু (স্পার্ম) এলে ডিম্বানু ও শুক্রাণুর মিলনে নিষেক ঘটবে। তৈরি হবে ভ্রূণ৷

দুদিন অপেক্ষা করার পরে যদি শুক্রাণু না আসে (যৌন মিলন না ঘটে)। তখন জরায়ুতে বসে থাকা ডিম্বাণু বেরিয়ে যায় দেহ থেকে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ও উঠে হেঁটে বেরিয়ে যেতে পারেনা৷ যে আঙুল গুলো গেঁথে দিয়েছিলো জরায়ুর গায়ে সেগুলো খুবলে বের করে আনে। জরায়ু ক্ষতবিক্ষত হয় ও রক্তপাত শুরু হয়। সেই রক্তই ৫-৭ দিন অনবরত বেরোতে থাকে। তার মধ্যে নতুন কোষ সৃষ্টি হয়ে জরায়ু নিজেকে ফের সাজিয়ে নেয়।

সাধারণত ২৮-৩১ দিন অন্তর এই চক্র চলতে থাকে। একমাসে বাম ডিম্বাশয় তো পরের মাসে ডান ডিম্বাশয় থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশের মেয়েদের সাধারণত ১০-১৩ বছরের মধ্যেই প্রথম রজঃস্রাব শুরু হয়।

প্রেগন্যান্সির সময় রজঃচক্র বন্ধ থাকে কেন? কারণ সেই সময় ডিম্বানুর পরিনত হওয়া বন্ধ থাকে।

কারুর কারুর ক্ষেত্রে তলপেট ও কোমরে এই সময় অসম্ভব ব্যথা অনুভুত হয়। আমার এক বান্ধবী রজঃস্রাব চলাকালীন যন্ত্রণায়ে কাঁদে। আমার আবার ব্যথা হয়না বললেই চলে। ব্যথা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। পিরিয়ডের কারণে হওয়া ব্যথাকে ডিসমেনোরিয়া বলা হয়। অত্যধিক রক্তপাত, মাসলের ব্যথা, রক্তের জমাট বেঁধে স্বাভাবিক রক্তপাত না হওয়ার কারণে ব্যথা হতে পারে। তবে প্রচন্ডরকম ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক নয়। ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

 বাজারে একটা জোক খুব চলে, মেয়েরা পিরিয়ড চললে বড় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। অল্পেতে কাঁদে, বিরক্ত হয়। আমিই জুরাসিক পার্কের টি.রেক্স হয়ে যাই। বাড়িতে কেউ ঘাঁটায় না বিশেষ। সারাক্ষণ তলপেট ভারী আর বাথরুমে গেলেই একরাশ রক্ত দেখলে বিরক্ত কে হবে না বলুন? তার মাঝে এভাবে বসলে দাগ লাগবে, ওভাবে শুলে ব্যথা হবে তো লেগেই থাকে। এরপরেও আছে হরমোনের পরিবর্তন। গোটা ব্যাপারটাই বেশ কিছু হরমোনের উপর নির্ভর করে। ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টেরন ছাড়াও হাইপোথ্যালামাস থেকে বেরোনো আরো প্রচুর হরমোনের মারামারিতে সাধারণত মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়ই।

এবার আসি পিরিয়ড না হলে কী হতে পারে তাতে। পিরিয়ড না হলে সন্তানধারণ করা যায়না (ডিম্বকই তৈরি না হলে ভ্রূণ গঠন সম্ভব না)। অনেকসময়েই বিভিন্ন কারণে পিরিয়ড অনিয়মিত হয়ে যায়। যেমন পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিসিস ( PCOD) এই রোগে ডিম্বাশয়ে অনেক টিউমার তৈরি হয় স্বাভাবিক ডিম্বানুর পরিনত হওয়া ব্যাহত হয়। অনেক সময় জরায়ুর অভ্যন্তরে চর্বি জমে যায় ও নিয়মিত পিরিয়ড হয়না। তাই কোনোমাসেই পিরিয়ড বন্ধ হলে দৌড়াতে দৌড়াতে গাইনোকোলজিস্টের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। উপরের সব অসুখই সারিয়ে তোলা সম্ভব। কারুর পিসিওডি আছে মানেই তার দ্বারা সন্তানধারণ হবেনা এটা ভুল ধারণা। সঠিক চিকিৎসা, এক্সারসাইজ, ডায়েটেই এগুলো সেরে যায়৷

জরায়ু যেখানে যোনীতে উন্মুক্ত হয়,তার নাম সারভিক্স। যোনীর মধ্যে সাধারণত ১-২ সেমি ভিতরে হাইমেন নামের একটি অত্যন্ত পাতলা পর্দা থাকে। যা পুরুষাঙ্গের আঘাতে ছিঁড়ে যায় বলা হয়। হাইমেন সমগ্র যোনীকে আচ্ছাদন করে থাকে না। থাকে না। যদি থাকতো তাহলে রজঃস্রাব হতোই না৷ অনেকের ধারণা মেন্সট্রুয়াল কাপ কিম্বা ট্যাম্পুন ব্যবহারে হাইমেন ছিঁড়ে যেতে পারে। এটা অত্যন্ত ভ্রান্ত ধারণা৷ যোনীপথে একটি আঙুল প্রবেশ করলে সেটি হাইমেন অব্ধি পৌঁছায় না। তাই মেন্সট্রুয়াল কাপ বা ট্যাম্পুন ও পৌঁছাবে না। সাধারণত আমরা যেমন জীবনধারণ করি তাতে বেশিরভাগ মেয়েরই হাইমেন আগে থেকেই ছিঁড়ে যায়। সাঁতার কাটলে, সাইকেল চালালে, জিম করলে। তাই বাসররাতে খাটের সাদা চাদর সাদা থেকে গেলে কিছু করার নেই।(বা আপনার সুবিশাল ইমানদন্ড যা আপনার গর্ব, তা হয়ত আপনার বউয়ের ভ্যাজাইনার মাপে ছোট।হাইমেন রইল হাইমেনেই,আপনার যন্তর কাজকর্ম সেরে বেরিয়ে এলো।)
আর ফুলশয্যাতেই যারা অতো কিছু করে ফেলে বিশাল স্ট্যামিনা ভাই তাদের।রোজ রিভাইটাল খায় আর ভাইজানের সিনেমা দ্যাখে। আমি তো বিরিয়ানি খেয়ে বর জড়িয়ে উল্টে ঘুমাবো।
হাইমেন রিপ্লেসমেন্টও হয় আজকাল। ওভাবে হাইমেন ফাটলো কিনা দেখে কী লাভ জানিনা।
শরীরে পবিত্রতা বলে কিছু হয়না। একটা মানুষের শরীরে ঠাকুর দেবতার বালাই নেই কোনো। ভার্জিনিটি আর হাইমেনের কোনো লিঙ্ক নেই।

লেখাটা পড়ে কোনো জায়গায় কোনো প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় জিগ্যেস করুন। যথাসাধ্য উত্তর দেব। এঁকেও বুঝিয়ে দিতে পারি (সিরিয়াসলি বললাম। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি আঁকাও শিখিয়েছিলো)। কোনো জায়গা ভুল আছে মনে হলে সরাসরি বলুন। (ময়ূরের চোখের জলে ময়ূরী প্রেগন্যান্ট হয় টাইপের কথা বললে, খিস্তি দেব জেনেই আসবেন)। সরল করে লিখতে গিয়ে কিছু জিনিস বেশিই সরল করে ফেলেছি বোধহয়৷
শেষে বলি, কারুর যদি মনে হয় ফেসবুকে এমন লেখা উচিৎ না, তাতে আমার একগাছা কুঞ্চিত যৌনকেশও ছেঁড়া যায়না।
❤❤❤

©শ্রায়া

#শরীরের_গপ্প

বি. দ্র.

১. এই পোস্টটি শুধু সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। আপনার পারসোনাল সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করুন।

২. এই পোস্টে কেউ এই সংক্রান্ত কোন অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন,কিন্তু কোন ওষুধের নাম লিখবেন না। আপনি কোন ওষুধের নাম লিখলে তা দেখে অন্য কেউ সেই ওষুধ খেয়ে নিজের চিকিৎসা নিজেই করতে গিয়ে অসুস্থ হলে তার দায় পোস্টদাতার নয়।

৩. কিছু বিষয় অতি সরলভাবে লিখেছি,যাতে বুঝতে সুবিধা হয়। বিষয়টা আদতেও অত সোজা নয়। যারা জানেন না,এটা তাদের জন্য।

Comments